অনতিক্রম্য, অনিঃশেষ এবং অনিবার্য রবীন্দ্রনাথ

অনতিক্রম্য, অনিঃশেষ এবং অনিবার্য রবীন্দ্রনাথ

আকাশে রবি উদিত হলে, কারো ভালো লাগুক আর নাই লাগুক; কেউ নিন্দা করুক, আর কেউ প্রশংসা করুক—তাতে রবির যায় আসে না। তবে যারা নিন্দা করেন, তাদেরও চলে না রবির আলোবিহীন। রবির কৃপা সবার জন্যই অনিবার্য। আলোহীন জীবনের অস্তিত্বই ব্যর্থ। তারপরও কেউ কেউ রবির অনিবার্যতাকে অস্বীকার করতে চান, অথবা কেউ কেউ করেন; কিংবা বলেন—রবিবাবু এখন পুরনো হয়ে গেছেন, উনি  ব্যাকডেটেড। কিন্তু যারা এসব কথা বলেন, তারও কিন্তু রবির কৃপায় নিজের জীবনের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রেখেছেন। বাতাস যেমন দেখা যায় না, কিন্তু তার অস্তিত্ববিহীন একমুহূর্তও জীবন বাঁচে না; অনুরূপ রবির কিরণ এবং রবীন্দ্রনাথের প্রতিভা সার্বজনীন। তিনি এক হাতে লিখেছেন কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, গীতিনাট্য, নৃত্যনাট্য, নাট্যকাব্য অর্থাৎ সর্বক্ষেত্রেই বিচরণ করেছেন সাবলীল দক্ষতায়। বিশেষত, বাংলা সাহিত্যের গল্প তো তাঁর হাতেই শুরু হয়ে বিকাশও লাভ করেছে। এমনকি উপন্যাসও রবীন্দ্রনাথের হাতে ভিন্ন একমাত্রা লাভ করেছিল। এসব কিছুর বাইরে আছে—রবীন্দ্রনাথের বিশাল গানের ভুবন। এতোকিছু একজন লেখকের পক্ষে তখনই সৃষ্টি করা সম্ভব, যখন তিনি সর্বান্তকরণে নিজেকে নিয়োজিত করেন সাহিত্যের সেবায়। ফলে এরকম বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে যারা রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করেন, বা করতে চান—তারা যে বাংলা সাহিত্যের বিরাট এক বটবৃক্ষকে অস্বীকারের অপচেষ্টায় নিয়োজিত, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। একালে নতুন এক ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে—দু’লাইন কিংবা দু’একটা কবিতার বই লিখেই নিজেকে কেউ কেউ রবীন্দ্রনাথের সমকক্ষ অথবা তাঁর চেয়েও নিজেকে বড় ভাবতে শুরু করেন। এসব লেখক জানেন না যে, রবীন্দ্রনাথ আপাদমস্তক সাহিত্যসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন; কোনো অহি নাজেলের পর তিনি লিখতেন না। আমৃত্যু তিনি লেখাটাকে নিজের কর্ম হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। অর্থাৎ লেখার পিছনে তিনি শ্রম দিয়েছেন; সেই শ্রমের ফসল হিসেবে পরিণামে বাংলা সাহিত্যের ঘরে গল্প-কবিতা-নাটক-উপন্যাস বিবিধ রচনার বিশাল পরিধি গড়ে উঠেছে। সুতরাং দু’একটি কবিতার বই লিখে যারা রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করেন কিংবা তাঁকে পুরনো, ব্যাকডেটেড ভাবার দুঃসাহস দেখাচ্ছেন, কালক্রমে তাদের অস্তিত্ব তথা লেখকসত্তা যে প্রশ্নবিদ্ধ হবেই সেকথা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ প্রসঙ্গে আরো একটি দিকের কথাও স্মরণ রাখা ভালো—বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিশ শতকের পঞ্চাশ-ষাট দশকের কোনো কোনো কবির কাব্যসংখ্যা সত্তর-আশির চেয়েও বেশি। কেউ কেউ তাঁদের এই রচনাসংখ্যার কথা বিবেচনা করেই হয়তো তাঁদেরকে রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বড় কবি ভেবে বসেন; কিন্তু কোনোভাবেই এরকম ভাবার সুযোগ নেই। কেননা, প্রথমত তাঁদের রচনাসংখ্যার কথা বিবেচনা করলে সাময়িক সময়ের জন্য আমাদের মনে হতে পারে—যিনি এত লিখেছেন, তিনি তো বড় কবিই। কথাটি মাথায় রেখেই যদি সেই বিস্তর সংখ্যক কাব্যের জন্মদাতা কবির রচনার বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়, তখন দেখা যাবে—সাকুল্যে হয়তো সেই কবির পাঁচ-ছয়টি কাব্য টিকে যাবে; যেখানে হয়তো তাঁর নিজস্ব ভাষা, প্রকরণ কিংবা দার্শনিক প্রতিভাষ্য নির্মাণ ও উত্তরণ ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন অর্থাৎ গুটিকয়েক রচনা শিল্পোত্তীর্ণ হিসেবে গণ্য হবে। বাকি বা অবশিষ্ট বিরাট সংখ্যক রচনা দেখা যাবে—সেই কবির রচনার অনুবর্তন বা আবর্তন অথবা চর্বিতচর্বণ ছাড়া অন্যকিছু নয়। দ্বিতীয়ত, সংখ্যার বিবেচনায় হয়তো তিনি রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বেশি কবিতা লিখতেই পারেন; কিন্তু তাঁর হাতে কয়টি গল্প, উপন্যাস, নাটক অথবা প্রবন্ধগ্রন্থ রচিত হয়েছে—সেটাও বিবেচনার দাবি রাখে। শুধুমাত্র কবিতা রচনার সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথকে অতিক্রম করেই নিজেকে রবীন্দ্র-অতিক্রান্ত ভাবার বিশেষ কোনো সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। আমাদের নিকট মনে হয়েছে, হিমালয়কে হয়তো-বা অতিক্রম করা যায়, কিন্তু একজীবনে কোনো বাঙালি লেখকের পক্ষে রবীন্দ্রনাথকে অতিক্রম করা অসম্ভব কিংবা বলা ভালো, তিনি অনতিক্রম্য বা দূরাতিক্রম্য। সুতরাং হাল আমলে যারা, দু’চারখানা পদ্য লিখে অথবা দুএকটি উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করে অধ্যাপনা পেশায় নিয়োজিত হয়ে—রবীন্দ্রনাথকে সমালোচনা করেন, তাঁকে অস্বীকার করার মতো ধৃষ্টতা দেখান, তাদের মনে রাখা দরকার—বামন কখনোই চাঁদের নাগাল পায় না। প্রসঙ্গত একথাও বলে রাখি যে, সমকালীন বৈশ্বিক বাস্তবতায় হয়তো রবীন্দ্রনাথের অনেক চিন্তাভাবনা পিছিয়ে পড়েছে; তার মানে এই নয় যে, সমগ্র রবীন্দ্রনাথ পিছিয়ে পড়েছে! কেননা আমৃত্যু সাহিত্যসেবায় নিয়োজিত রবীন্দ্রনাথ ক্রমাগত নিজেকে নিজেই অতিক্রম করেছেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ‘ভাণুসিংহের পদাবলি’ [১৮৮৪], ‘কড়ি ও কোমল’ [১৮৮৬]-এ রবীন্দ্রনাথের যে জাগরণ, তা ‘মানসী’ [১৮৯০] কিংবা ‘সোনার তরী’ [১৮৯৪] কাব্যে এক ভিন্নমাত্রা পেয়েছে। আবার ‘গীতাঞ্জলি’ [১৯১০] পর্বে সেই রবীন্দ্রনাথই আধ্যাত্মিকতায় লীন হওয়া এক ধ্যানমগ্ন মানুষ। পূঁজাপর্বের এই রবীন্দ্রনাথকেই আর ‘বলাকা’ [১৯১৬] পর্বের রচনায় খুঁজে পাওয়া যায় না—এখানে তিনি হয়ে ওঠেন এক বিজ্ঞানমনস্ক এক আধুনিক দার্শনিক। এখানেই শেষ নয়, এরপরে আছে ‘পুনশ্চ’ [১৯৩২], ‘পত্রপুট’ [১৯৩৬]-এর মতো কাব্যগ্রন্থ; এসব কাব্যে রবীন্দ্রনাথ পূর্বের সব দার্শনিক ভাষ্যকে অতিক্রম করে নতুনতর ভাষা ও চিন্তাকে আরেক নতুন মাত্রা দিয়েছেন। এই রবীন্দ্রনাথ আবার ‘রোগশয্যায়’ [১৯৪০], ‘আরোগ্য’ [১৯৪১], ‘জন্মদিনে’ [১৯৪১] অথবা ‘শেষ লেখা’ [১৯৪১] কাব্যে পুনরায় নতুনতর কথা বলেছেন, যা পাঠককে অনিবার্যভাবেই ভিন্নতর এক বোধের স্তরে নিয়ে যায়। সুতরাং শুধুমাত্র কবিতার ক্ষেত্রেই রবীন্দ্রনাথ নিজেকে কতবার অতিক্রম করেছেন—সেকথা নিশ্চয়ই ভাবনার বিষয়। এসব কথা গেল রবীন্দ্রনাথের কবিতা নিয়ে; কবিতার বাইরেও পড়ে রইল রবীন্দ্রনাথের বিরাট সাহিত্যভাণ্ডার। সেখানে আছে  তাঁর গল্প-উপন্যাস-নাটক-প্রবন্ধ এবং গীতবিতানের বিরাট গানের সম্ভার। ‘বৌ-ঠাকুরাণীর হাট’ [১৮৮৩] উপন্যাস লিখে রবীন্দ্রনাথ যে যাত্রা শুরু করেছিলেন, সেই গৎবাঁধা কাহিনীর বৃত্তের নিজেকে আটকে রাখেন নি; অল্প পরেই তিনি ‘চোখের বালি’ [১৯০৩] লিখে বাংলা উপন্যাসের ধারাকে এক ভিন্নখাতে প্রবাহিত করেছেন; যেখানে কাহিনীর পরতে পরতে রয়েছে মানবচরিত্রের মনোজগতের অনুপুঙ্খ বিচার-বিশ্লেষণ। এই রবীন্দ্রনাথ আবার চরিত্রের মনোজাগতিক বিষয়াদি তুলে আনার পাশাপাশি সমকালীন রাজনীতিকে তুলে আনলেন ‘গোরা’ [১৯১০] অথবা ‘ঘরে-বাইরে’ [১০১৬] উপন্যাসে—যেখানে রবীন্দ্রনাথকে পুনরায় নতুনভাবে আবিষ্কার করে তন্বিষ্ঠ পাঠক। অথবা তাঁর ‘শেষের কবিতা’ [১৯২৯] উপন্যাসকেও কী নিছক প্রেমের উপন্যাস ভাবার সুযোগ আছে? এখানেও তিনি দেখিয়েছেন প্রেমের বিচিত্র রূপ-রঙ-রস এবং আছে, আছে তার ভিন্নতর ইহজাগতিক নানাদিক এবং বহুস্তরের দার্শনিক ভাষ্য-প্রতিভাষ্য। একইভাবে তাঁর গল্প-নাটকের ক্ষেত্রেও বিচিত্র উত্তরণ এবং দার্শনিকতার সন্ধান মেলে সহজেই। যে রবীন্দ্রনাথ এত বিচিত্র, যাঁর ভাবনা এত বৈচিত্র্যময়, তাঁকে বাঙালি লেখক-পাঠকের পক্ষে কী করে অস্বীকার করা সম্ভব—সেটা ঠিক বোধগম্য হয় না।

Add Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *